সাইকোপ্যাথ এবং সোশিওপ্যাথ চেনার উপায় : শেষ পর্ব
আবার আরেক ধরনের সাইকোপ্যাথের দেখা পাওয়া গেল, যারা অধিকাংশ সময়ে এমপ্যাথিবিশিষ্ট সাধারণ মানুষের জীবন যাপন করেন, কিন্তু জীবনচক্রের কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাইকোপ্যাথের সব কটি বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করেন।
এত এত বৈপরীত্য দেখে বিজ্ঞানীরা বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। কেউ কেউ সাইকোপ্যাথকে ভাগ করলেন দুই ভাগে :
১. হাই ফাংশনিং সাইকোপ্যাথ
২. লো ফাংশনিং সাইকোপ্যাথ
যুক্তি দাঁড় করালেন, যাদের সাইকোপ্যাথি জেনেটিক বা মস্তিষ্কের অস্বাভাবিকতার কারণে প্রাপ্ত, যারা অনেক ক্যালকুলেটেড, হাই IQ বিশিষ্ট, ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করেন এবং আগ্রাসন, উত্তেজনা কিংবা আবেগতাড়িত হয়ে কাজ করা এড়িয়ে চলেন তারা হাই ফাংশনিং সাইকোপ্যাথ।
আরো পড়ুন : সাইকোপ্যাথ এবং সোশিওপ্যাথ চেনার উপায় : পর্ব ১
লো ফাংশনিং সাইকোপ্যাথের সংজ্ঞা হাই ফাংশনিংয়ের কাছাকাছি।
তবে তারা লো আইকিউ বিশিষ্ট, তুলনামূলক অধিক আগ্রাসী মনোভাবসম্পন্ন এবং হাই ফাংশনিংদের তুলনায় কম সফল।
কিন্তু যাদের কোনো জেনেটিক বা নিউরোবায়োলজিকাল অস্বাভাবিকতা নেই, অথচ সাইকোপ্যাথির প্রতিটি ক্রাইটেরিয়া বহন করছে, তাদের কোনো ক্যাটাগরিতে ফেলা যাচ্ছিল না। কেউ কেউ লো ফাংশনিং ক্যাটাগরিতে ফেলতে চাইলেও বাদানুবাদ থামছিল না।
এরই মাঝে আমেরিকান একজন সাইকোলজিস্ট দ্বন্দ্ব নিরসনে ‘Sociopath’ (সোশিওপ্যাথ) টার্মটি ব্যবহার করেন।
নাম তার জর্জ এভারেট পারট্রিজ (George Everett Partridge) যাদের সাইকোপ্যাথিক ট্রেইটের কোনো জিনগত ব্যাখ্যা নেই এবং যাদের মস্তিষ্কের গঠন স্বাভাবিক তাদের সাধারণত সোশিওপ্যাথদের অন্তর্ভুক্ত করা হলো। গবেষণায় প্রমাণিত হলো, অতীতের কোনো ভয়ংকর স্মৃতি, গ্যাসলাইটিংয়ের শিকার হওয়া, এবিউসিভ শৈশব থেকে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজ-অর্ডার (PTSD) সোশিওপ্যাথি গঠনে ভূমিকা পালন করে।
সোশিওপ্যাথরা আবেগতাড়িত এবং তুলনামূলক আগ্রাসী। ঠাণ্ডা মাথায় হিসাব-নিকাশ করে কাজ করে না।
তবে আইনের পরোয়া না করা, অনুশোচনা না থাকার ক্ষেত্রে সাইকোপ্যাথদের সমগোত্রীয় হিসেবেই বলা যায় এদের। সোশিওপ্যাথদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামান্য বিবেকের উপস্থিতি এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার কিছু দক্ষতা দেখা দেয়।
ওই দিকে যেসব সাইকোপ্যাথের জেনেটিক বেসিস না থাকায় কোনো কাতারে ফেলা যাচ্ছিল না, তাদের স্থান দেওয়া হলো হাই ফাংশনিং সোশিপ্যাথ ক্যাটাগরিতে। হাই ফাংশনিং সোশিওপ্যাথরাও হাই ফাংশনিং সাইকোপ্যাথদের মতো উচ্চ IQ বিশিষ্ট, প্রতিটি পা ফেলার আগে ছক কষে ফেলে, অসাধারণ ম্যানিপুলেশনের ক্ষমতা বিশিষ্ট, ইম্পালসিভ বা আবেগতাড়িত হয়ে কাজ করে না। কেবল তাদের জিনগত এবং মস্তিষ্কের গঠনগত কোনো অস্বাভাবিকতা নেই।
বেশ কিছু সাইকিয়াট্রিস্ট অবশ্য ‘সোশিওপ্যাথ’ ক্যাটাগরিতে বিশ্বাস করেন না। তারা ASPD-কে সাইকোপ্যাথি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
সাইকোপ্যাথ এবং সোশিওপ্যাথ শব্দ দুটি চলচ্চিত্র জগৎ কিংবা ফিকশন উপন্যাসের পাতায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়। মনোবিজ্ঞানী এবং বিশেষজ্ঞ ফরেনসিক সাইকিয়াট্রিস্টরা গবেষণার ক্ষেত্রে সাইকোপ্যাথি এবং সোশিওপ্যাথি টার্ম ব্যবহার করেন। তবে ক্লিনিক্যাল ডায়াগনসিসের ক্ষেত্রে কখনোই ‘সাইকোপ্যাথ’ এবং ‘সোশিওপ্যাথ’ শব্দ দুটি ব্যবহার করা হয় না। উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে ASPD (Antisocial Personality Disorder) রোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
কালের কণ্ঠে প্রকাশিত আমার নন ফিকশন এর নির্বাচিত অংশ: ৩৪ তম পর্ব
লেখক : চিকিৎসক ও কথাসাহিত্যিক