সাইকোপ্যাথদের মস্তিষ্কের গঠন

আপনাদের ডাক্তারি শেখানোর কোনো ইচ্ছা নেই আগেই বলেছি। যাতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের কেউ না হয়েও আপনারা খুব সহজে সাইকোপ্যাথদের মস্তিষ্কের আনাচেকানাচে একটু ভ্রমণ করতে পারেন, তাদের বুকের ভেতরের হাহাকারের কারণ জানতে পারেন, সেই চেষ্টা করছি।
আমাদের মস্তিষ্কের তিনটি অংশ- অগ্রমস্তিষ্ক, মধ্যমস্তিষ্ক এবং পশ্চাৎমস্তিষ্ক। মস্তিষ্ক দেখতে কেমন তা আপনারা সবাই কমবেশি জানেন।

অনলাইনের যুগে মস্তিষ্কের ছবির সহজলভ্যতা বলাই বাহুল্য। এর উপরিভাগ অনেকটা ঢেউ খেলানো এবং রং ধূসর। একে বলে গ্রে ম্যাটার। আর ভেতরে যেই অংশ চোখে দেখতে পাওয়া যায় না, সেই স্তরে থাকে স্নায়ুতন্ত্র যার রং সাদা।

ঢেউ যুক্ত উঁচু অংশকে বলে জাইরাস। দুটো ঢেউযুক্ত অংশের মধ্যবর্তী খাঁজকে বলে সালকাস। অগ্রমস্তিষ্কের তিনটি অংশ- ‘সেরেব্রাম’, ‘থ্যালামাস’ এবং ‘হাইপোথ্যালামাস’। এবার প্রসঙ্গে আসি।

সাইকোপ্যাথদের মস্তিষ্কের সেরেব্রামের নিম্নোক্ত অংশগুলো জন্ম থেকেই সুগঠিত নয় কিংবা কোনো দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পাওয়ার কারণে বড়ো ধরনের অসংগতিপূর্ণ।

প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স
মাথার খুলির যে অংশে কপাল রয়েছে, সে অংশসহ সামনের দিকের কিছু অংশে সুরক্ষিত মস্তিষ্কের খণ্ড।

কাজ: আমাদের যৌক্তিক চিন্তাভাবনা, আবেগ এবং গৃহীত পদক্ষেপের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে। এ অংশের আবেগের মধ্যে রয়েছে ইতিবাচক আবেগ- (সুখ, স্বস্তি, কৃতজ্ঞতাবোধ) এবং নেতিবাচক আবেগ-(রাগ, বিদ্বেষ, হিংসা, দুঃখ)। সাইকোপ্যাথদের এ অংশ অপরিণত।

তাই বাহ্যিক ঘটনার সাথে তারা আবেগের সমন্বয় ঘটাতে পারে না। যেমন- দুঃখের কোনো ঘটনা ঘটলে তারা উচ্চস্বরে হেসে উঠতে পারে। বেদনা কিংবা বিষন্নতার অনুভূতি তাদের মধ্যে অনুপস্থিত। বিদ্বেষ, স্বস্তি, আনন্দ কিছু পরিমাণে দেখা যায়। কিন্তু তাদের মাঝে আনন্দের উপস্থিতি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, তাদের আনন্দের অনুভূতি নেই।
সুপিরিয়র টেম্পোরাল জাইরাস
আমাদের কানের আশেপাশে মাথার খুলির যে অংশ রয়েছে তার ভেতর সুরক্ষিত মস্তিষ্কের খণ্ড)।
কাজ: সোশ্যাল কগনিশন- অর্থাৎ সমাজের মানুষের চিন্তা-চেতনার সাথে নিজেদের চিন্তার সমন্বয় করে আমাদের খাপ খাওয়ানোর দক্ষতা বৃদ্ধি করে। সাইকোপ্যাথদের মস্তিষ্কের এ অংশ সঠিকভাবে কাজ করে না। ফলে সামাজিক নিয়ম-নীতি মেনে চলা বা আইন পালন করার মতো বাধ্যবাধকতাগুলোর সাথে তারা খাপ খাওয়াতে পারে না।

অ্যান্টেরিয়র সিংগুলেট কর্টেক্স:
দুটো সেরেব্রাল খণ্ডের কেন্দ্র বরাবর উপরের দিকে।
কাজ: উদ্দীপনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, লাভ-ক্ষতির হিসাবনিকাশ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ, দ্বন্দ্ব নিরসন এবং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া। সাইকোপ্যাথদের মস্তিষ্কে এ অংশের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কম। অতি উদ্দীপিত হয়ে আগের ভুল থেকে শিক্ষা না নিয়েই তারা যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অনেকের ক্ষেত্রেই বজায় থাকে।

লিম্বিক সিস্টেম
এ অংশ সেরেব্রাল কর্টেক্সের হিপপোক্যাম্পাস, অ্যামিগডালা এবং অগ্রমস্তিস্কের তৃতীয় অংশ হাইপোথ্যালামাসের সমন্বয়ে গঠিত।

কাজ: আবেগ (বিশেষত ভয়, দুঃশ্চিন্তা, দুঃখবোধ) নিয়ন্ত্রণ এবং যথাসময়ে প্রকাশ ঘটানো। স্মৃতি সংরক্ষণ করা। শিক্ষা গ্রহণ, আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা। সাইকোপ্যাথদের ক্ষেত্রে এ অংশ একেবারে কাজ করে না। ফলে তাদের ভয়, শঙ্কা, দুঃখ ইত্যাদি অনুভূতি নেই। আমাদের মস্তিষ্কের আরেকটি প্রক্রিয়ার নাম রিঅ্যাওয়ার্ড মেকানিজম। সহজ বাংলায় বললে, কিছু কাজ করলে মস্তিষ্কে সুখের অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। মস্তিষ্ক একটা স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ডোপামিন নামের একটি রাসায়নিক পদার্থ ক্ষরণ করে এবং সেই কাজটি বারবার করে। যেমন- কারো জাংক ফুড খেতে ভালো লাগলে মস্তিষ্ক বারবার তার ভিজুয়াল কর্টেক্সকে রেস্টুরেন্টের লোভনীয় ছবির দিকেই টেনে নিয়ে যাবে। এ প্রক্রিয়া শুরু হয় মধ্যমস্তিষ্কে। সাইকোপ্যাথদের এই রিওয়ার্ড সিস্টেম অ্যাকটিভেট থাকে দেখে নিজেদের পছন্দের কাজটি তারা বারবার করে। আবার মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেম স্মৃতি সংরক্ষণ করে। ধরুন, একটি স্বাভাবিক মানুষ চুরি করে ধরা খাওয়ার পর শাস্তি পেল। তার লিম্বিক সিস্টেম এই ঘটনাটি সংরক্ষণ করে তাকে সতর্ক করে দিলো যে আরেকবার চুরি করলে তাকে বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। সাইকোপ্যাথদের ক্ষেত্রে এই মেকানিজম কাজ করে না বিধায় তারা শাস্তির পরোয়া না করেই অপরাধমূলক কাজ করে যেতে পারে।

কালের কণ্ঠে প্রকাশিত আমার নন ফিকশন এর নির্বাচিত অংশ:  ৩৫ তম পর্ব

লেখক: চিকিৎসক ও কথাসাহিত্যিক